ম্যানিফেস্টেশন বলতে কী বোঝায় ? ম্যানিফেস্টেশন আসলে কতটা কাজ করে
মন থেকে চাইলেই কি মহাবিশ্ব শুনতে পায় ?
ম্যানিফেস্টেশন আসলে কতটা কাজ করে
ধরুন, বেশ কিছুদিন ধরে আপনি চাকরি বদলানোর কথা ভাবছেন। এক বিকেলে পুরোনো এক বন্ধু ফোন করে বললেন, “শোন, আমাদের এখানে একটা পদ খালি হয়েছে। তুই আবেদন করবি?” ফোনটা রেখে মনে হল, কী আশ্চর্য! ঠিক এটাই তো চাইছিলাম।
এমন সময় মনে হতেই পারে, মহাবিশ্ব বুঝি মনের কথা শুনেছে। একটু পরে অবশ্য আরেকটা কথা মনে পড়ল। মাসখানেক আগে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে এই বন্ধুকেই বলেছিলেন, “কোথাও ভালো কাজের খবর পেলে জানাস।” আপনি কথাটা ভুলে গিয়েছিলেন। বন্ধু ভোলেননি।
ঘটনাটাকে কেউ ম্যানিফেস্টেশন বলবেন, কেউ বলবেন যোগাযোগ রাখার সুফল। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়। আমরা কিছু খুব করে চাইলে সেই চাওয়া কি বাইরের ঘটনা বদলে দিতে পারে? এখন পর্যন্ত এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যে শুধু চিন্তার জোরে মহাবিশ্ব আমাদের পছন্দমতো ঘটনা ঘটায়। তবে কী চাই তা স্পষ্ট করে ভাবলে আমাদের কিছু সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। যেমন, সেদিন চায়ের দোকানে নিজের ইচ্ছেটা মুখ ফুটে বলা।
ম্যানিফেস্টেশন বলতে কী বোঝায় ?
রন্ডা বার্ন তাঁর ‘The Secret’ বইয়ে ম্যানিফেস্টেশনের একটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রথমে নিজের চাওয়াটা স্পষ্ট করে চাইতে হবে, তারপর তা পাওয়ার বিশ্বাস রাখতে হবে এবং নিজেকে তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি চোখ বুজে কল্পনা করা এই চর্চার অংশ। বার্ন মনে করেন, আমাদের চিন্তা ও অনুভূতি একই ধরনের অভিজ্ঞতাকে জীবনে টেনে আনে। তিনি একে ‘আকর্ষণের সূত্র’ বলেছেন। এই ‘সূত্র’ তাঁর বিশ্বাসের ভাষা। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন কোনও নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
রক্সি নাফুসির ‘Manifest’ বইটিতেও মহাবিশ্বের ওপর আস্থা রাখার কথা আছে। পাশাপাশি তাঁর সাতটি ধাপের মধ্যে আছে নিজের চাওয়া পরিষ্কার করা, ভয় ও সংশয় সামলানো, লক্ষ্যের সঙ্গে কাজের মিল রাখা এবং বাধা এলে তা মোকাবিলা করা। যা আছে তার কদর করা ও কৃতজ্ঞ থাকা, আর অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা হলে সেই অনুভূতি থেকে শেখার কথাও তিনি বলেছেন।
ঈর্ষার কথাটাই ধরা যাক। এক সহকর্মী নতুন চাকরি পেয়েছেন। খবরটা শুনে একটু খারাপ লাগল। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, তাঁর চাকরির কোন দিকটা আপনারও পেতে ইচ্ছে করছে? বেশি বেতন? বড় পদ? নাকি বাড়ির কাছে অফিস হওয়ায় যাতায়াতের ধকল কমেছে, নিজের জন্য একটু সময় পাচ্ছেন? শেষের কারণটাই যদি আপনাকে বেশি টানে, তাহলে নিজের চাওয়াটাও কিছুটা পরিষ্কার হয়। হয়তো আপনার কাছে ভালো চাকরি মানে এমন একটা কাজ, যার পরেও নিজের জন্য সময় থাকে। পরের বার কোনও চাকরির বিজ্ঞাপন দেখলে বেতনের পাশাপাশি কাজের সময় আর যাতায়াতের দূরত্বটাও খোঁজ নেবেন।
সাফল্যের ছবি কল্পনা করলে কি সাফল্য কাছে আসে ?
নতুন অফিসে প্রথম দিনটা কেমন হবে, সুখবরটা বাড়িতে কাকে আগে দেবেন—এসব ভাবতে ভালো লাগে। কিন্তু সেই ভালো লাগার পর কি আবেদনপত্রটা লিখতে বসার ইচ্ছেও বাড়ে ?
মনোবিজ্ঞানী হেদার ক্যাপস ও গ্যাব্রিয়েলে ওটিঙ্গেন ২০১১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের চারটি পরীক্ষায় এই প্রশ্নের একটা অপ্রত্যাশিত দিক দেখিয়েছিলেন। সবকিছু সহজে মনের মতো হয়ে গেছে, এমন ভবিষ্যৎ কল্পনা করার পর কিছু পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণকারীদের উদ্যম কমে গিয়েছিল। কাজেই স্বপ্নটা যত সুন্দর করে কল্পনা করতে পারছি, তার জন্য তত ভালো প্রস্তুতিও নিচ্ছি—এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ম্যানিফেস্টেশনে বিশ্বাস নিয়েও সরাসরি গবেষণা হয়েছে। লুকাস ডিক্সন ও তাঁর সহকর্মীরা তিনটি গবেষণায় মোট ১,০২৩ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। যাঁদের এই বিশ্বাস বেশি ছিল, তাঁরা নিজেদের তুলনামূলকভাবে বেশি সফল মনে করতেন এবং ভবিষ্যৎ সাফল্য নিয়েও বেশি আশাবাদী ছিলেন। এখানে ‘মনে করতেন’ কথাটা জরুরি। কেউ নিজের সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাবাদী, এটুকু জানলে তাঁর বিশ্বাসের কারণে সত্যিই চাকরি বা পদোন্নতি হয়েছে কি না, তা বোঝা যায় না।
তাহলে নিজের জীবনে কীভাবে কাজে লাগাবেন ?
এখানে চাকরি বদলানোর উদাহরণ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে পড়াশোনা, নতুন কোনও দক্ষতা শেখা বা নিজের কাজ শুরু করার ক্ষেত্রেও চাওয়াটা স্পষ্ট করা, বাধা চেনা আর পরের পদক্ষেপ ঠিক করার অনুশীলন করা যায়।
বন্ধুর ফোনটার কথায় ফেরা যাক। তিনি বিজ্ঞাপনটা পাঠিয়েছেন। কাজটা আপনার পছন্দও হয়েছে। এখন পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করতে পারেন।
১. আমি ঠিক কী চাই ?
“চাকরি বদলাতে চাই” আপনার ইচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনটা পড়ে যদি মনে হয় কাজের সময় আর যাতায়াত, দুই-ই আপনার সুবিধেমতো, তাহলে এ সপ্তাহের লক্ষ্যটাও লিখে ফেলতে পারেন। “শুক্রবারের মধ্যে এই পদে আবেদন করব।” এবার অন্তত বুঝতে পারবেন, সপ্তাহ শেষে নিজের চাওয়ার দিকে এক পা এগোলেন কি না।
২. আমি সাধারণত কোথায় আটকে যাই ?
আগেও হয়তো পছন্দের কোনও চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করতে চেয়েছেন। জীবনপঞ্জিটা খুলে মনে হয়েছে, “আর একটু গুছিয়ে লিখি, তারপর পাঠাব।” পরদিন আবার পড়ে মনে হয়েছে, এখনও কিছুটা বাকি। এভাবে করতে করতে আবেদনের শেষ দিনটাই পেরিয়ে গেছে। এমন হলে নিজেকে একটু সময় দিয়ে ভাবুন, কী নিয়ে এত দ্বিধা হচ্ছে? হয়তো মনে মনে ভয় পাচ্ছেন, “এটা দেখে ওরা আমাকে যোগ্য মনে করবে তো?” ভয়টা কোথায়, সেটা বুঝতে পারলে পরের পদক্ষেপ নেওয়া একটু সহজ হয়। পরিচিত কাউকে জীবনপঞ্জিটা দেখিয়ে বলতে পারেন, “একবার পড়ে বলবে, কোথাও কিছু অস্পষ্ট লাগছে কি?”
৩. সেই বাধা এলে এবার কী করব ?
আবেদন পাঠানোর সময় আবারও মনে হতে পারে, “আর একটু ভালো করে লিখলে হয়তো সুযোগটা বাড়ত।” তখন নিজেকে আলতো করে মনে করিয়ে দিন, “যত্ন নিয়ে লিখেছি। এবার একটা সুযোগ দিয়ে দেখি।” আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে পারেন, “আজ সন্ধেয় দ্বিধা হলে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে জীবনপঞ্জিটা আর একবার মিলিয়ে নেব। দরকারি তথ্য বাদ পড়েছে কি না দেখব, ভুল থাকলে শুধরে রাত আটটার মধ্যে পাঠিয়ে দেব।” পাঠানোর পরও একটু অস্বস্তি থাকতে পারে। তবু নিজের চাওয়ার দিকে একটা পা বাড়ানো হবে।
এভাবে ভাবার পক্ষে কিছু প্রমাণ আছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে ২১টি গবেষণার মোট ১৫,৯০৭ জন অংশগ্রহণকারীর ফল একসঙ্গে দেখা হয়েছিল। নিজের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ কল্পনা করা, বাস্তবে কোন বাধাটি আসতে পারে তা চেনা এবং সেই বাধা এলে কী করবেন তা আগেই ঠিক করে রাখা—এই অনুশীলন লক্ষ্যপূরণে গড়ে ছোট থেকে মাঝারি মাত্রায় সাহায্য করেছিল। গবেষকেরা জানিয়েছেন, প্রকৃত উপকার এই হিসাবের চেয়ে কিছুটা কমও হতে পারে। এই গবেষণায় বাধা চেনা ও পরিকল্পনা করে কাজ করার অনুশীলন পরীক্ষা করা হয়েছে। মহাবিশ্ব মানুষের ইচ্ছা পূরণ করে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়নি।
তারপরও আবেদন পাঠিয়ে ডাক না-ও পেতে পারেন। সংস্থা কাকে খুঁজছে, কতজন আবেদন করেছেন, শেষ মুহূর্তে নিয়োগ পিছিয়ে গেল কি না—অনেক কিছুই আপনার অজানা। তাই কোনও স্বপ্ন অপূর্ণ থাকলে “আমি বোধহয় যথেষ্ট মন থেকে চাইনি” বলে নিজেকে দোষ দেওয়া অন্যায়।
হয়তো আবেদন পাঠানোর আগে বন্ধুকে আপনি আর একবার ফোন করবেন। “তুই তো ওখানে কাজ করিস। একটা কথা বল তো, রোজ বাড়ি ফিরতে ক’টা বাজে?” প্রশ্নটা সামান্য। অথচ উত্তরটা শুনে আপনি চাকরিটা চাইতেও পারেন, আবার বিজ্ঞাপনটা সরিয়েও রাখতে পারেন। নিজের ইচ্ছে নিয়ে মন দিয়ে ভাবার একটা মূল্য এখানেই। একসময় শুধু জানতেন, চাকরি বদলাতে চান। এখন জানেন, সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে কোন জীবনটার জন্য সময় রাখতে চান।
মূল সূত্র
১. রন্ডা বার্নের The Secret — ম্যানিফেস্টেশন সম্পর্কে লেখিকার ব্যাখ্যা
২. রক্সি নাফুসির Manifest — সাত ধাপের পরিচয়
৩. ক্যাপস ও ওটিঙ্গেন — ভবিষ্যতের সুখকর কল্পনা ও উদ্যম নিয়ে গবেষণা
৪. ডিক্সন ও সহকর্মীরা — ম্যানিফেস্টেশনে বিশ্বাস ও সাফল্যের ধারণা নিয়ে গবেষণা
৫. ওয়াং ও সহকর্মীরা — লক্ষ্যপূরণ নিয়ে ২১টি গবেষণার বিশ্লেষণ
